জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি ও দায় নির্ধারণে এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত দিয়েছে জাতিসংঘের শীর্ষ আদালত আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। আদালতের অভিমত অনুযায়ী, এখন থেকে কোনো দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে, অন্য দেশের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করতে পারবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অভিমত বাধ্যতামূলক না হলেও বিশ্বজুড়ে আইনি ও কূটনৈতিক পর্যায়ে এর প্রভাব পড়বে। জলবায়ু ইস্যুতে প্রথমবারের মতো এত স্পষ্টভাবে আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা নির্ধারণ করল আইসিজে।
আদালতের প্রেসিডিং জজ ইওয়াসাওয়া ইউজি বলেন, “কোনো দেশ জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় উচ্চাকাঙ্ক্ষী উদ্যোগ না নিলে তা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হবে।” তিনি আরও বলেন, “প্যারিস চুক্তিতে না থাকলেও, আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় দেশগুলো জলবায়ু রক্ষা করতে বাধ্য।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন থেকে কার্বন নিঃসরণে ভূমিকা রাখা দেশগুলো ক্ষতিপূরণের আওতায় আসতে পারে—বিশেষ করে উন্নত ও শিল্পোন্নত দেশগুলো।
এ রায়কে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ‘আইনি বিজয়’ হিসেবে দেখছে জলবায়ু আন্দোলনকারীরা। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জের পক্ষ থেকে মামলায় অংশ নেওয়া টোঙ্গার সিওসিউয়া ভেইকুনে বলেন, “আমি বাকরুদ্ধ। এটি আমাদের জনগণের বিজয়।”
ভানুয়াতুর ফ্লোরা ভানো বলেন, “এই জয় শুধু আমাদের নয়, বরং সেইসব মানুষদের জন্য, যারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে জলবায়ু লড়াইয়ে নেমেছেন।”
আদালত রায়ে বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন, অবকাঠামো ও জনজীবনের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করা যাবে। ক্ষতি পুনর্গঠন সম্ভব না হলে, অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ চাওয়া যাবে। কোনো দেশের অভ্যন্তরে পরিচালিত জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানির কার্যক্রমের জন্য সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র দায়ী থাকবে।
আইসিজের রায় পরামর্শমূলক (advisory opinion), অর্থাৎ এটি কার্যকর করতে রাষ্ট্রের সম্মতির প্রয়োজন। যেমন যুক্তরাজ্য আইসিজের এখতিয়ার স্বীকার করলেও যুক্তরাষ্ট্র ও চীন তা করে না।
তবে পরিবেশ আইনজীবী জোয়ে চৌধুরী বলছেন, “এই অভিমত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আদালতে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারবে। এটি আইনগতভাবে একটি টার্নিং পয়েন্ট।”
এই অভিমতের ভিত্তিতে এখন জলবায়ু-ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলো অতীতের কার্বন নিঃসরণজনিত ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারবে। মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ জানায়, তাদের জলবায়ু অভিযোজনে প্রয়োজন ৯ বিলিয়ন ডলার।
পরিবেশ কর্মীদের মতে, এই রায় উন্নত দেশগুলোর জন্য জবাবদিহির সুযোগ তৈরি করবে এবং জলবায়ু ন্যায়ের আন্দোলনে গতি আনবে।