বছর জুড়ে দূর্নীতি অনিয়মের কারণে সমালোচনার শীর্ষে থাকা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের শীর্ষ চারপদে পরিবর্তন আনতে চায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। সুত্রমতে , আড়াই হাজার কোটি টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক প্রকৌশলী গোলাম ইয়াজদানীর উপর হামলার পর থেকে গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে চসিকের উপর। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সচিব খালেদ মাহমুদকে বদলির মধ্য দিয়ে দাপ্তরিক সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে।
দীর্ঘদিন থেকে ক্ষমতার চেয়ার আঁকড়ে রেখে নিজের আত্নীয় পরিজনকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে নিয়োগ, অযোগ্যদের কাছে পদোন্নতি বিক্রি করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সচিব ‘খালেদ মাহমুদ’ গেল পাঁচ বছরে অনিয়ম দূর্নীতির বটগাছ হয়ে উঠেন। অবশেষে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ছাড়তেই হচ্ছে দুর্দান্ত প্রতাপশালী এই কর্মকর্তাকে । চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আলোচিত সচিব খালেদ মাহমুদকে বদলি করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
সোমবার (১৭ জুলাই) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊনি-২ শাখা থেকে এ বিষয়ে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। অন্য একটি আদেশে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে সচিব হিসেবে সরকারী আবাসন পরিদপ্তরের (গণপূর্ত) উপ পরিচালক শহিদুল ইসলামকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সচিব হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশে ওই প্রজ্ঞাপনগুলোয় সই করেছেন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মেহেদী হাসান।
চসিকের সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেবার পর থেকে অভিযোগের পাহাড় জমেছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
সচিব ‘খালেদ মাহমুদ’ ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের মেয়ে শায়লা শারমিন মুমুকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন পরিচালিত পুর্ব বাকলিয়া উচ্চ বালিকা স্কুল এন্ড কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেন । ২০২২ সালের জানুয়ারী মাসে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সচিবের দায়িত্ব পালন করা অবস্থায় সরকারী চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে নিজের মেয়েকে নিয়োগ দেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে নিজের আত্মীয় পরিজনদের মধ্যে প্রভাব খাটিয়ে অন্তত ১৫ জনকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন বিভাগে চাকরি দিয়েছেন তিনি ।
এমন গুরুতর অভিযোগ উঠার পরও তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয় নি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। পদোন্নতি ও নিয়োগ বাণিজ্য, ঠিকাদারীর আভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট লালন করে বিপুল অর্থ বৈভবের মালিক হয়েছেন খালেক মাহমুদ। সেই সিন্ডিকেটের ফরমায়েশ অনুযায়ী কাজ না দেয়ায় চসিকের আড়াই হাজার কোটি টাকার প্রকল্প পরিচালক গোলাম ইয়াজদানীর উপর হামলা করে দুর্বৃত্তরা। নিজের কার্যালয়ে ঠিকাদার নামধারী দুর্বৃত্তদের হাতে মারধরের শিকার হওয়া ওই প্রকল্প পরিচালক চার মাসের বেশি সময় ধরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে অনুপস্থিত।
জানা যায়, ঢাকার স্থানীয় ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে বসে চসিকের এই প্রকল্প পরিচালক এখন নিজের দায়িত্ব পালন করছেন। সুত্রমতে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নিয়োগ, পদোন্নতিতে অনিয়ম দূর্নীতির জাল তৈরি করেছেন তিনি। এরআগেও এক দফা বদলী করা হয়েছিলো তাকে, শেষ পর্যন্ত চসিকের শীর্ষকর্তাকে ম্যানেজ করেই টিকিয়ে রেখেছেন সচিবের চেয়ার।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কম্পিউটার ট্রেইনিং সেশন মিস করার কারণে কোরবানি ঈদের আগে অন্তত পঞ্চাশ কর্মচারীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ ইস্যুর পাশাপাশি সবার বেতন বোনাস আটকে দেন৷ ঈদের মতো উৎসবের আগে তার এমন রূঢ় আচরণে ক্ষুদ্ধ চসিক কর্মচারীদের মাঝে চরম অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। চসিকে কর্মরত হাবিব নামের এক ড্রাইভার সচিব খালেদ মাহমুদের ব্যক্তিগত কাজে মিরসরাই যেতে রাজি না হওয়ায় আটকে দেয়া হয়েছে তার বেতনও।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের রাজস্ব বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বেনামে ফইল্লাতলি কিচেন মার্কেটে তিনটি দোকান হস্তগত করেছেন খালেদ মাহমুদ।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নগরের হালিশহর ফইল্যাতলী বাজারে ৩০ দশমিক ৮৪ গণ্ডা জমির ওপর ১১ তলা বিশিষ্ট সমন্বিত কিচেন মার্কেট তৈরী করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন।হালিশহর ফইল্যাতলী বাজারে ২০ কোটি ৬৯ লাখ ৩৯ হাজার টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা কিচেন মার্কেটের ১০ তলা মার্কেটে নিজের ভাগ নিয়েছেন এই তিন দোকান বরাদ্ধ নিয়ে । এই প্রকল্পের মোট ব্যয়ের নব্বই শতাংশই বিশ্বব্যাংকের এজেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইডা) থেকে নেয়া ঋন ; বাকি ১০ শতাংশ চসিক তার নিজস্ব তহবিল থেকে খরচ করছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সুত্রমতে, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের দূর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য গোয়েন্দা প্রতিবেদন সংগ্রহ করা হয়েছে। চসিকের দূর্নীতি চার কুশিলবের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি চুড়ান্ত করেছে মন্ত্রণালয়। পরিকল্পনার শুরুতে ‘সচিব’ খালেদ মাহমুদকে সরানো হয়েছে। প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামকে সরিয়ে দেয়ার বিষয়টিও চুড়ান্ত করেছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিব। স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর টেবিল পেরুলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ছাড়তে হবে তাকেও৷ সুত্রমতে, চসিকের প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ার পরিবর্তনের সব আনুষ্ঠানিকতাও শেষ। প্রধান প্রকৌশলীর অনাপত্তিপত্র পেলেই এলজিডি’র শীর্ষ তিন প্রকৌশলীর একজনের আবির্ভাব ঘটবে চসিকে।
বিদ্যুৎ উপ বিভাগ থেকে আরেক ভারপ্রাপ্ত তত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর লুটপাটের পরিসমাপ্তি ঘটবে খুব শিগগিরই। সেন্টাল প্রকিউরমেন্ট ইউনিট (সিপিটিইউ) ইতিমধ্যে ওই দূর্নীতিবাজ প্রকৌশলীর প্রকল্প পরিচালক (এলইডি) হিসেবে অযোগ্যতার চুড়ান্ত মতামত দিয়েছে।
চসিকের শীর্ষ পদে বসে কর্মকর্তারা কোটি কোটির মালিক হলেও, সেবা নিয়ে বরাবরই অসন্তুষ্ট নগরবাসী। দূর্নীতি, অনিয়ম-বিশৃঙ্খলার কারণে বছর জুড়ে ‘চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন’ শিরোনাম হয়েছে গণমাধ্যমে। গৃহকর বৃদ্ধি থেকে শুরু করে জলাবদ্ধতা নিরসনে চরম ব্যর্থতা, আলোক ব্যবস্থার আধুনিকায়নের নামে লুটপাট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নামে ময়লা বাণিজ্য ও শ্রমিক-কর্মচারী অসন্তোষ; প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম মানিক, নির্বাহী প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন, ঝুলন কুমার দাশসহ সিভিল ও বিদ্যুৎ উপ বিভাগের অধিকাংশ প্রকৌশলীর চসিকের সাথে ব্যবসা করা, নগরের ৪৬৬ কিলোমিটার সড়কে ২৬০ কোটি টাকার স্মার্ট এলইডি প্রকল্পের ঠিকাদার নিয়োগে চার বছর পার করা ; টেন্ডার ভাগাভাগি করে বিক্রি – নজিরবিহীন দূর্নীতির দাগ লেগেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের গায়ে।
মাননহীন মশার ঔষধ কিনে একটি দূর্নীতিবাজ চক্রকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের শত কোটি টাকা লুটপাটের সুযোগ তৈরি করে দিলেও ; মশার কামড় থেকে রেহাই দিতে পারেনি নগরবাসীকে। যার প্রমাণও মিলে সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের মূল্যায়নে। নাগরিক সুবিধার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ, নিরাপদ পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, দাপ্তরিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাসহ সাতটি সূচকে গত দুই অর্থবছরে পিছিয়ে গেছে চসিক।
এভাবে প্রায় প্রতিটি বদলি ও রদবদল, অনিয়মের ক্ষেত্রে কর্পোরেশনের একটি সিন্ডিকেট প্রকারান্তরে বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্য করেছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পাঁচটি চেয়ারে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা হলে কর্পোরেশন দুর্নীতিমুক্ত হবার পথ সুগম হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।