ঢাকারবিবার, ৩রা মার্চ, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সন্ত্রাসী বাহিনী ইসলাম’ গ্রুপে রাতে আদালতে চলে ভয়ংকর নির্যাতন।

মো:আয়াছুল আলম সিফাত, কক্সবাজার প্রতিনিধি
ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২২ ৩:৫২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

মো:আয়াছুল আলম সিফাত,কক্সবাজার।

তিনপাশে বন আর একপাশে নাফনদী। এমন পরিবেশে গড়ে তোলা ২২ নং রোহিঙ্গা ক্যাম্প দিনদিন হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে নানা অপকর্মের জন্য। রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপের তৎপরতা, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানসহ নানা অপরাধ যেনো এই ক্যাম্পের নিত্যনৈমত্তিক ব্যাপার। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যেও এমন নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এই ক্যাম্পটিকে। 

 

সম্প্রতি কক্সবাজারের টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উনচিপ্রাংয়ের এই রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অপরাধের অনুসন্ধান করতে গিয়ে ক্যাম্পে নিয়মিত যাতায়াত করেন এমন একজন ব্যক্তি নাম পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কথা বলেন তিনি জানান, 

রোহিঙ্গা ক্যাম্পটি এখন নতুন করে সংঘবদ্ধ হওয়া একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করে। এই গ্রুপের নাম ‘ইসলাম গ্রুপ’। মোহাম্মদ ইসলাম নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে গড়ে উঠা এই সন্ত্রাসী গ্রুপ এখন রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং আশপাশের এলাকার আতঙ্ক হয়ে উঠেছে। 

 

একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ২২ নাম্বার রোহিঙ্গা ক্যাম্প মূলত ইসলাম গ্রুপের শাসন আর হুকুম চলে। প্রতিরাতে অনেকটা আদালত বসিয়ে সাধারণ মানুষের বিচার করে এই গ্রুপ। বিচারকের ভূমিকা পালন করেন মোহাম্মদ ইসলাম নিজেই। রোহিঙ্গাদের মধ্যে সংগঠিত নানান ঘটনার বিচার করে যা রায় দেয়, তা ভয়ংকর শাস্তির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করে তারা৷ এটাই তাদের আধিপত্য বিস্তারের অন্যতম মাধ্যম। 

 

বন প্রহরী এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই ব্যক্তির দাবী, সন্ত্রাসী গোষ্ঠি আরসা বা আল ইয়াকিং সাধারণ রোহিঙ্গাদের নির্যাতন চালাতো। তাদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলে সাধারণ রোহিঙ্গাদের সমর্থন আদায় করে ইসলাম গ্রুপ। এক পর্যায়ে আরসা তথা আল ইয়াকিন ক্যাম্প থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর নিজেদের আসল রূপ দেখাতে শুরু করে এই সন্ত্রাসী বাহিনী। 

 

নাম পরিচয় গোপন রেখে আরো একজন ভুক্তভোগী এবং প্রত্যক্ষদর্শী কথা জানান। তিনি জানান, ২০২১ সালের আগষ্ট থেকে নিজেদের অবস্থান জানান দেয় এই সন্ত্রাসী বাহিনী। স্থানীয় এলাকাবাসীর উপর তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে তার সন্তানকে অপহরণ করে নিয়ে যায় ইসলাম গ্রুপ। পরে গ্রামবাসী ঝাপিয়ে পড়ার পাশাপাশি প্রশাসন দ্রুত তৎপরতা শুরু করায় বাধ্য হয়ে ছেড়ে দেয় তার সন্ত্রানকে। 

 

তিনি আরো জানান, ইসলাম গ্রুপের সন্ত্রাসীরা উনচিপ্রাংয়ের এই গ্রামটিতে প্রতিরাতে গুলি বর্ষণ করে। আতঙ্কিত হয়ে গ্রামবাসী চিৎকার চেঁচামিচি করলে নির্যাতন চালায়। প্রতিরাতে অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয়। মূলত গুলি চালিয়ে মানুষকে আতঙ্কিত করে ইয়াবা পাচারের জন্য রাস্তা নিরাপদ করে বলে দাবী করেন তিনি।

 

২২ নাম্বার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চারপাশে কাঁটাতার কেটে বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্প থেকে বের হওয়ার পথ তৈরি করেছে সন্ত্রাসীরা। ক্যাম্পে অপরাধ সংগঠিত করার পর সেসব পথ দিয়ে পালিয়ে যায় গহীন অরণ্যে। ক্যাম্পের আশপাশের বনগুলো এখন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানা। এখানে অপহরণ, খুন, অস্ত্র তৈরীসহ নানা অপরাধ নির্বিঘ্নে সংগঠিত করে তারা। কিন্তু কাঁটাতারের বিভিন্ন অংশে ওয়াচ টাওয়ার করা হলেও অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বরত কাউকে দেখা যায়নি। 

 

ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি পেলে বা কোন অপরাধ করে বেকায়দায় পড়ে গেলে নাফনদী হয়ে মিয়ানমার পালিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। তাছাড়া মিয়ানমার থেকে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানের জন্যও প্রতিরাতে নাফ নদীর এই পথ ব্যবহার করে সন্ত্রাসীরা।

 

রাতে এমন একজন জেলের সাথে কথা বলি যিনি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের যাতায়াত প্রায় সময় প্রত্যক্ষ করেন।

 

 

সন্ত্রাসী ইসলাম গ্রুপের মোহাম্মদ ইসলাম কে সেটি জানতে আমরা কথা বলি একজন রোহিঙ্গার সাথে। পরিচয় গোপন রেখে তিনি বলেন, মিয়ানমারের কুমিরখালী এলাকায় জন্ম এবং বেড়ে উঠেছেন ইসলাম। পরে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা ঢলের সময় বাংলাদেশে এসে ২২ নাম্বার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। আনুমানিক ৩৫ বছর বয়সী ইসলাম এক সময় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপ আরসার সাথে সম্পৃক্ত ছিল। পরে স্বার্থের দ্বন্দ্বে আরসার সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয় তার। এরপর নিজেই গড়ে তুলেন নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী। 

ক্যাম্পে সংগঠিত প্রায় ঘটনার বিচার এখন ইসলাম গ্রুপের আদালতে করা হয় বলে দাবী করেন তিনি। তবে অনেক রোহিঙ্গা ইসলাম সম্পর্কে কথা বলতে রাজি হননি।

 

২২ নম্বর ক্যাম্প রোহিঙ্গা সমতল থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন। এই বিচ্ছিন্ন হওয়ার সুযোগে ক্যাম্পটি সন্ত্রাসী দলের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। অস্ত্র ও মাদক পাচারসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা এখানে গা ঢাকা নিয়ে থাকছে। ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায় নিরাপদ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ইসলাম গ্রুপসহ সকল সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে চিরুনি অভিযানের দাবী সাধারণ রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের।